জন্ম থেকে ২ বছর: আপনার শিশুর গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোনগুলো চিনে নিন

শিশুর জন্মের পর প্রথম দুই বছর যেন এক জাদুকরী সফর! চোখের পলকে তারা ছোট্ট একটি নবজাতক থেকে হেঁটে-ছুটে বেড়ানো দুষ্টু মিষ্টি শিশুতে পরিণত হয়। প্রতিটি নতুন দিন তাদের জীবনে নিয়ে আসে নতুন কিছু শেখার আনন্দ—যা আমরা “বেবি মাইলস্টোন” (Baby Milestones) বা বিকাশের ধাপ হিসেবে চিনি।
প্রতিটি শিশুর বৃদ্ধির গতি আলাদা, তাই আপনার শিশুর বিকাশ অন্য শিশুর সাথে হুবহু না মিললেও দুশ্চিন্তার কিছু নেই। চলুন জেনে নেওয়া যাক ০ থেকে ২৪ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুদের গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক, সামাজিক ও মানসিক মাইলস্টোনগুলো।
০ থেকে ৬ মাস: নতুন জগতের সাথে পরিচয়
প্রথম ৬ মাসে শিশু প্রধানত তার ইন্দ্রিয়গুলোর (দেখা, শোনা, স্পর্শ) সাথে পরিচিত হতে শুরু করে।
০-৩ মাস
- শারীরিক পরিবর্তন: সোজা হয়ে শুয়ে মাথা সামান্য উঁচুতে তোলার চেষ্টা করে।
- সামাজিক বিকাশ: ২ মাসের দিকে প্রথমবারের মতো সুন্দর করে হাসে (যাকে আমরা Social Smile বলি)।
- যোগাযোগ: মা বা পরিচিতদের গলার আওয়াজ শুনলে চুপ হয়ে যায় বা প্রতিক্রিয়া দেখায়।
৪-৬ মাস
- শারীরিক পরিবর্তন: পেটের ভরে শুয়ে থেকে মাথা ও বুক পুরোপুরি তুলতে পারে। একপাশ থেকে অন্যপাশে উপুড় হতে শেখে।
- হাতে জিনিস ধরা: রঙিন খেলনা দেখলে ধরতে চায় এবং কোনো কিছু হাতে পেলেই সোজা মুখে দেয়!
- যোগাযোগ: নিজের মতো করে নানান শব্দ করতে শুরু করে (যেমন: “আ-গু”, “বা-বা”)।
৭ থেকে ১২ মাস: নড়াচড়া ও আবিষ্কারের সময়
এই সময় শিশু বেশ চঞ্চল হয়ে ওঠে এবং আশেপাশের পৃথিবীটা ঘুরে দেখতে পছন্দ করে।
৭-৯ মাস
- বসা ও হামাগুড়ি: কোনো সাহায্য ছাড়াই একা একা বসতে শেখে। বেশিরভাগ শিশু এই সময়ে হামাগুড়ি দেওয়া শুরু করে।
- জিনিস খোঁজা: কোনো খেলনা লুকানো হলে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করে।
- Separation Anxiety: পরিচিত মানুষদের চিনতে পারে এবং মা-বাবা চোখের আড়াল হলে কান্নাকাটি করতে পারে।
১০-১২ মাস
- দাঁড়ানোর চেষ্টা: আসবাবপত্র ধরে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারে। কেউ কেউ ধরে ধরে হাঁটার চেষ্টাও করে।
- প্রথম শব্দ: ‘মা-মা’, ‘বা-বা’ বা ‘দা-দা’-র মতো স্পষ্ট শব্দ বলতে শুরু করে।
- ইশারা করা: ‘বাই-বাই’ জানাতে হাত নাড়াতে পারে এবং আঙুল দিয়ে পছন্দের জিনিস দেখিয়ে দেয়।
১৩ থেকে ১৮ মাস: ছোট ছোট পায়ে পথচলা
এক বছর পার হতেই শিশু আরও স্বাধীন হতে চায়।
- হাঁটাহাঁটি: সহায় ছাড়াই প্রথম একা একা হাঁটে এবং দৌড়ানোর প্রাথমিক চেষ্টা করে।
- নতুন শব্দবলি: এই বয়সে শিশু অন্তত ৫ থেকে ১০টি স্পষ্ট শব্দ বলতে পারে।
- অনুকরণ করা: বড়দের কাজ যেমন—ফোন কানে দেওয়া, চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ানোর নাটক করা ইত্যাদি দেখে দেখে শেখে।
- নিজে খাওয়ার চেষ্টা: চামচ বা হাত দিয়ে নিজে নিজে খাওয়ার চেষ্টা করে (যদিও ঘর একদম নোংরা করে ফেলবে!)।
১৯ থেকে ২৪ মাস: কথা ও ভাবনার নতুন দিগন্ত
দুই বছর পূর্ণ হওয়ার দিকে শিশু বেশ বুদ্ধিমতি/বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে এবং নিজের মনের ভাব প্রকাশে পটু হতে শুরু করে।
- হাঁটা ও দৌড়ানো: চমৎকারভাবে দৌড়াতে পারে, লাথি মেরে বল খেলতে পারে এবং ছোট সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারে।
- ছোট বাক্য তৈরি: দুই বা তিনটি শব্দ মিলিয়ে বাক্য বলতে শুরু করে (যেমন: “দুধ খাবো”, “বাইরে যাবো”)।
- আদেশ পালন: “জুতো নিয়ে আসো” বা “খেলনা রাখো”-র মতো ২ ধাপের সহজ নির্দেশ বুঝতে ও মানতে পারে।
- খেলনার ধরন: ব্লক দিয়ে টাওয়ার বানানো, বইয়ের পাতা উল্টানো এবং ছবির দিকে আঙুল নির্দেশ করে জিনিস চেনা শিখতে পারে।
মা-বাবাদের জন্য বিশেষ টিপস:
মাইলস্টোনগুলো শুধুই একটি সাধারণ নির্দেশিকা। কোনো শিশু হয়তো ১০ মাসে হাঁটে, আবার কেউ ১৪ মাসে। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তবে যদি আপনার মনে হয় শিশু ৯ মাসেও সাহায্য ছাড়া বসতে পারছে না, ১২ মাসেও কোনো শব্দ বা প্রতিক্রিয়া করছে না, কিংবা কোনো আলো/শব্দে সাড়া দিচ্ছে না—তবে দেরি না করে শিশু বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করুন।